চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিদ্যালয়টির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ
এক শতাব্দীরও বেশি আগে চন্দনাইশ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের সুযোগ আজকের মতো সহজ ছিল না। বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইতিহাসে বলা হয়েছে, তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল খুবই কম। সেই বাস্তবতায় বাবু নিত্যানন্দ কুন্ড ও বাবু গৌরচন্দ্র দাশ শিক্ষার প্রসারে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের জমি ও আর্থিক সহযোগিতাও প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রাখে।
তাদের সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে বিদ্যালয়টি চন্দনাইশসহ আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
শতবর্ষের পথচলা
প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়টি নানা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও শিক্ষা-সংক্রান্ত নথিতেও গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র বিদ্যালয়ের নাম পাওয়া যায়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বিদ্যালয়ের সাফল্যের কথা সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
কৃতী শিক্ষার্থীদের স্মৃতি
এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাহিত্যিক, রাজনীতিক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বের নাম পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক আহমদ ছফা এই বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব অলি আহমদও এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখিত।
ফলে বিদ্যালয়টির ইতিহাস শুধু একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের শিক্ষাজীবন ও চন্দনাইশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যালয়ের বর্তমান কার্যক্রমে অনলাইন ভর্তি, ফলাফল, রুটিন, নোটিশসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা রয়েছে। পাশাপাশি রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, বিতর্ক, প্রকৃতি ক্লাব ও রেড ক্রিসেন্টের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমও রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয়টি কিছু সমস্যারও মুখোমুখি হয়েছে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিক্ষক সংকট এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার বিষয় উঠে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিদ্যালয়টির শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একটি বিদ্যালয়, একটি অঞ্চলের স্মৃতি
গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাস মূলত চন্দনাইশের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসেরই একটি অংশ। একসময় যে অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, সেই অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে শিক্ষার প্রথম বড় ধাপ অতিক্রম করেছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠানটি আজও টিকে আছে। পুরোনো দিনের স্মৃতি, কৃতী শিক্ষার্থীদের সাফল্য এবং বর্তমান প্রজন্মের স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় চন্দনাইশের শিক্ষা-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শতবর্ষ পেরিয়েও এই বিদ্যালয়ের সামনে তাই একই প্রত্যাশা—শিক্ষার আলো আরও বিস্তৃত হোক, নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠুক জ্ঞান, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের আদর্শে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন